ক্র্যাব সদস্যরা রক্তের টান দেখালেন, মনোবল বাড়িয়ে দিলেন - adsangbad.com

সর্বশেষ

Friday, May 8, 2020

ক্র্যাব সদস্যরা রক্তের টান দেখালেন, মনোবল বাড়িয়ে দিলেন


সাইদুর রহমান রিমন : রাত ৯ টা থেকেই ক্র্যাব মেম্বার্স পেইজে সালেহ আকন, হাসান জাভেদ, বিপ্লব বিশ্বাস, দুলাল হোসেনসহ কয়েকজনের দারুণ সব হাসি রহস্যের আক্রমণ পাল্টা আক্রমণাত্মক বাক্য পড়ছিলাম। লকডাউনের বিপর্যয়কর সময় পার করতে দারুণ উপভোগ্য লাগছিল তাদের এ পেইজ আড্ডা। কবীর টিপু কেবলই বাড়ির চৌবাচ্চায় ইলিশ চাষের গল্প শুরু করেছে আর ঠিক তখনই রাত ০৯ টা ৩২ মিনিটে কামরুজ্জামান খানের ছোট দু লাইনের বার্তা :'ভোরের কাগজের আসলাম ভাইয়ের অবস্থা গুরুতর। প্লিজ কেউ কিছু করেন এখনি...'
সঙ্গে সঙ্গে সব আড্ডাবাজি, উচ্ছ্বাস আনন্দ উ'বে গেল। মুহূর্তেই ক্র্যাব মেম্বার্স পেইজ হয়ে উঠলো উদ্বেগ উৎকন্ঠা আর দায়িত্ববোধের অন্যরকম এক কার্যক্ষেত্র। কয়েক মুহূর্তেই হালিম ছুটলেন এ্যাম্বুলেন্স নিয়ে, তার আগেই আসলামের শান্তিবাগস্থ বাসায় পৌঁছে গেলেন ভোরের কাগজের ইমরান। গুরুতর আসলামকে নিয়ে যাওয়া হলো ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে। কিন্তু এতেই ক্ষ্যান্ত ছিলেন না অন্যরা। ক্র্যাব সভাপতি খায়ের ভাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে আগাম ব্যবস্থা করে রাখেন। কথাবার্তা বলে সবকিছু ওকে করে ঢাকা মেডিকেল গেটেই দাঁড়িয়ে থাকেন শিমুল ও বাবু ভাই। এমদাদ কথা বলেন রিজেন্ট হাসপাতালে, আলাউদ্দিন আরিফ রীতিমত করোনা চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের সঙ্গেও কথা বলে প্রস্তুত করে রাখেন। বিকু ভাই, মাহমুদুর রহমান খোকন ভাইসহ অন্যরা যোগাযোগ করেন ডিআরইউ, ডিইউজে, বিএফইউজে নেতৃবৃন্দসহ স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে। যাদের একটা টেলিফোনেই ভিভিআইপি মর্যাদায় চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব। 
এতসবের মধ্যেও পেইজে একেকজন সদস্যের উৎকন্ঠা যেন শেষ হয় না। কেউ কেউ আরো কিছু করার তাগিদ দেন, কেউবা আসলামের স্ত্রী সন্তানদের পাশে যাওয়ার জন্যও অনুরোধ জানান। প্রতিটা মুহূর্ত কাটে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায়। যথারীতি ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল থেকে আসলামকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। এরপর....তারও পর রাত ১১ টা ০৩ মিনিটে 'অত্যন্ত দুঃখের সাথে ক্র্যাব সভাপতি ঢামেকের চিকিতৎসকের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন, আমাদের আসলাম ভাই আর নেই। ইন্নালিল্লাহ ওয়া ইন্নাইল্লাহে রাজিউন।' সবকিছু শেষ হয়ে গেল, সবই। করোনা যুদ্ধে আমরা পরিবারের আরেকজন সদস্যকে হারালাম, তিনি ছিলেন আমাদের বড়ই আপনজন।
===
আজ ক্র্যাব সদস্যদের পারস্পারিক সৌহার্দতা, কর্তব্য পরায়নতা, একের প্রতি অন্যের সহানুভূতিশীলতা দেখে নিজে আপ্লুত হয়ে পড়লাম, মনোবলও বেড়ে গেল সীমাহীন। সেই মনোবল দিয়ে হয়তো আসলামদের হারানোর শোক ব্যথা মুহূর্তেই মুছে ফেলা যাবে না; তবে এ মনোবল বেঁচে থাকতে সাহায্য করবে, পথ চলতে সাহায্য করবে আগামির। যেখানে করোনা সন্দেহে সবচেয়ে অপনজন বাবা-মাকে দূরের চরে, গহীন বনে ফেলে আসতে দ্বিধা করে না তাদেরই সন্তানেরা। ভাইরাস আক্রান্তের শঙ্কায় ছয় ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বাড়ির সিড়িতেই পড়ে থাকে তাদের প্রিয় বন্ধু খোকন সাহার লাশ। ঠিক সেই মুহূর্তেই প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুকে হাতে ধরে বুকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটলেন ক্রাইম রিপোর্টাররা। ভয়ঙ্কর করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ভয়াল হুমকিও তাদেরকে প্রিয়জন থেকে দূরে সরাতে পারেনি ! পারেনি !! 
গতকাল সকালে আমার মেয়ে উর্মির মুখ থেকেও এমন কথা শুনেছিলাম। সে বলছিল : 'বাবা গতকাল যখন গ্রামে গেলাম-লীজা আপু, দোলা ফুপী, কণিকা আন্টি সবাই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরলো। আমি বারবার বললাম-এ্যই করছো কী-করোনার ভয় নেই তোমাদের? আমরা তো করোনার হটস্পট ঢাকা থেকে এলাম-তোমরা দূরে দূরে থাকো। কে শোনে কার কথা। রক্তের টানের কাছে করোনা আতঙ্ক হার মেনেছে বাবা-সবাই আমাকে কোলে বসিয়ে, গলা জড়িয়ে আগের মতোই আদর করেছে, মমতা দেখিয়েছে।' 
===
আসলেই তো...রক্তের টানের কাছে  রোগ, আতঙ্ক, বিপদ, আক্রমণ সবই যে তুচ্ছ। ক্র্যাব সদস্যরাও কেবলমাত্র পেশাজীবী সংগঠনের সদস্য-সহকর্মিতে আবদ্ধ থাকেননি, তারা আমাদেরকে রক্তের টান অনুভবে সক্ষম হয়েছেন। মনোবল সৃষ্টি হয়েছে ঠিক এখানটাতেই।
তবে এতকিছুর পরও আমার মনে হয়েছে করোনা দুর্যোগকালীন সময়ের জন্য ক্রৗাবের একটা সমন্বিত টিম গঠন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন এ্যাম্বুলেন্স সহায়তার জন্য একজনের নেতৃত্বে কয়েকজনের একটি উপদল, চিকিৎসা ব্যবস্থা দেখভালের জন্য অনুরুপ একটা উপদল এবং আক্রান্ত সদস্যের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সার্বিক বিষয়াদি দেখাশোনার জন্য আরেকটি উপদল থাকতে পারে। এতে বিশৃঙ্খলার পরিবর্তে চমৎকার ভাবে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক (চিপ-ইন-ক্রাইম বাংলাদেশ প্রতিদিন)

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here

Pages